টাঙ্গাইলের নদীগুলো অস্তিত্ব সংকটে॥ নদীর তলদেশে হচ্ছে ধান চাষ

0

নিজস্ব প্রতিবেদক.
নদী চর, খাল বিল গজারির বন টাঙ্গাইলের শাড়ি তার গরবের ধন। এই শ্লোগান এখন 03আর টাঙ্গাইলের জন্য প্রযোজ্য হয় না। কারণ সেই নদী নালা, খাল বিল এখন আর নেই। অনেক আগেই টাঙ্গাইল শহর দিয়ে বয়ে চলা নদীগুলো ভরাট আর দখলের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। টাঙ্গাইলে সর্ববৃহত যমুনা নদী। এই যমুনা নদীর কয়েকটি শাখা নদী টাঙ্গাইল জেলাশহর ও উপজেলা শহরের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে। তার মধ্যে ধলেশ্বরী, ঝিনাই, বংশাই, বৈরান, এলানজানী ও শহরের উপর দিয়ে বয়ে চলা লৌহজং নদী অন্যতম। এই নদীগুলোও আজ ভরাট আর দখল হয়ে সরু খালে পরিনত হয়েছে। একসময় এই নদ-নদী দিয়ে বড় বড় লঞ্চ-স্টিমার চলাচল করতো। এখন শুস্ক মৌসুমে অনেক জায়গায় নদীর তলদেশে ধান চাষ করা হচ্ছে। 02টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়িতে লঞ্চ ঘাট ছিল। লঞ্চ ঘাটকে ঘিরেই বানিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। এখান থেকেই ধলেশ্বরী নদীর পানি আর খাটি দুধ দিয়ে প্রথম টাঙ্গাইলের সুস্বাধু পোড়াবাড়ির চমচম তৈরী হতো। সেই নদীর পানি আর নেই। সেই রকম সুস্বাধু চমচমও আর তৈরী হয় না।
টাঙ্গাইলের ভুঞাপুর ও বাসইল উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে গেছে ঝিনাই নদী ও বংশাই নদী। বাসাইলের লাঙ্গুলিয়া নদী, মধুপুরের টোকনদী, গোপালপুরের বৈরান নদী, টাঙ্গাইল শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে লৌহজং নদী। এক সময় এই নদীগুলো ছিল খর¯্রােতা। মির্জাপুরের উপর দিয়ে বয়ে চলা বংশাই নদীও ছিল প্রমত্তা। এ সব নদী দিয়ে মহাজনী নৌকা চলাচল করতো। নদী পাড়ের জেলেসহ অনেকেই মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। এসব নদীর অধিকাংশই পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেই। ভুমিদস্যুরা দখল করে নিয়েছে নদীর বেশিরভাগ জায়গা। নদী দখল করে কোথাও 01পাকা ইমারত, কোথাও ইটভাটা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি আবাদি জমি বানিয়ে রীতিমত ধান চাষ করা হচ্ছে।
লৌহজং যমুনার শাখা নদী। ভূয়াপুর থানা সদরের গাবসাড়া হতে উৎপন্ন হয়ে ভূয়াপুর থানা সদরের এক কিঃমিঃ উত্তরে পাঁচটিকরীতে ঝিনাই নদীর সাথে মিশে দক্ষিণ-পূর্বাভিমুখী হয়েছে। এসময় নদীটি টাঙ্গাইল শহর-করটিয়া, বাসাইল সীমান্ত দিয়ে মির্জাপুর-জামুর্কী হয়ে বংশাই নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ঢালান শিবপুর থেকে মির্জাপুরের বংশাই নদী পর্যন্ত প্রায় ৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লৌহজং নদী। টাঙ্গাইল শহরের উপর দিয়ে বয়ে চলা এই নদীর দুপাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার ঘর বাড়ি। এতে করে লৌহজং নদী দখল হয়ে সরু খালে পরিনত হয়েছে। দীর্ঘ ৫০ বছর পর গত ২০১৬ সালের দখল হয়ে যাওয়া টাঙ্গাইলের লৌহজং নদী রক্ষার জন্য তৎকালিন জেলা প্রশাসক মো. মাহবুব হোসেনের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু করেন টাঙ্গাইলের জনসাধারন। কয়েক মাস লৌহজং নদী দখলমুক্ত করার ঘোষনা দিয়ে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শহরে মাইকিং, নদীর ধারে মানববন্ধনসহ ফেসবুকে জনমত গঠনের বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের ২৯ নভেম্বর নদী দখল মুক্ত করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা “লৌহজং নদী রক্ষা করি- পরিবেশ বান্ধব টাঙ্গাইল গড়ি” শ্লোগান সম্বলিত হলুদ গেঞ্জি পড়ে, ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে নদীর ধারে জমায়েত হয়। হাজার হাজার জনসাধারণ নদীর দখলদার উচ্ছেদ ও অবৈধ স্থাপনা ভেঙ্গে দিয়ে নদীর খনন কাজ শুরু করেন। কৃষক শ্রমিক জনতালীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও এই অভিযানে যোগ দেন। বরিশাল থেকেও ৬০জন সেচ্ছাসেবক নদী দখলমুক্ত করার কাজে অংশ গ্রহন  করে। এর আগেই অনেক দখলদার তাদের ঘরবাড়ি নিজ নিজ উদ্যোগে ভেঙ্গে অন্যত্র সড়িয়ে নিয়ে যায়। ২/৩ মাস নদীর খনন কাজ করে ও ২কিলোমিটার নদী উদ্ধার ও দখলদার উচ্ছেদ করা হয়। নদীর দুই পাশে উচ্ছেদকৃত জমি উদ্ধার করে রাস্তা নির্মানসহ নদীর তলদেশ খনন কাজ করা হয়। নদীর পানি প্রবাহ শুরু হওয়ার আগেই সেই উদ্ধার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। আস্তে আস্তে উদ্ধার হওয়া সেই ২ কিলোমিটারও আবার দখল হতে শুরু করেছে। এদিকে বর্তমান জেলা প্রশাসক খান মো. নুরুল আমিন জেলাবাসীকে আশ্বাস দিয়েছেন-বন্ধ হয়ে যাওয়া খনন কাজ ও নদীর দুই পাশে দখলকদারদের উচ্ছে করে ৭৬ কিলোমিটার নদী দখলমুক্ত করা হবে।
বংশাই নদী বাসাইল উপজেলার পূর্ব সীমান্ত নির্ধারণী নদী। বংশাই নদী ও ঝিনাই নদীর একটি শাখার সাথে মিলিত হয়ে দক্ষিণে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর হয়ে, ঢাকার কালিয়াকৈরে দুইভাগ হয়ে মূল ধারা তুরাগ নামে দক্ষিণ-পূর্বদিকে গিয়ে ঢাকার মিরপুর হয়ে বুড়ীগঙ্গায় পড়েছে। দ্বিতীয় ক্ষুদ্র ধারাটি কালিয়াকৈর হতে দক্ষিণমুখী সাভার হয়ে ধলেশ্বরীতে পড়েছে। জেলার মাঝারি ধরনের নদীসমূহের মধ্যে বংশাই সবচাইতে দীর্ঘ। উৎপত্তিস্থল হতে সঙ্গমস্থল পর্যন্ত এটি দৈর্ঘ্যে ১০০ কিঃমিঃ।
ঝিনাই জামালপুরের বাউশী থেকে দুটি ভাগে ভাগ হয়ে একটি শাখা ডানদিকে বেঁকে যমুনার পূর্ব পাশ দিয়ে ভূয়াপুর থানার ৭ কিঃমিঃ দক্ষিণ-পশ্চিমে যোকার চরের কাছে ধলেশ্বরীর উৎসমুখের কাছে মিলিত হয়েছে। অপর শাখা দক্ষিণ-পূর্বমূখী হয়ে বাসাইল ফুলকী হয়ে বংশী নদীতে পতিত হয়েছে। অন্য অংশ দক্ষিণমুখী হয়ে বাসাইলের ফুলকী-আইসড়া, দেউলী, দাপনাজোর নথখোলা হয়ে দক্ষিণমুখী হয়েছে। বর্ষাকালে যমুনার পানি আসা মাত্রই ফুঁলেফেপে উঠে বংশাই নদী। তখন শুরু হয় ব্যাপক ভাঙ্গণ। মির্জাপুরের হাটুভাঙ্গা এলাকায় নদী দখল করে ১০/১৫টিরও বেশি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। এক সময়ের প্রমত্তা বংশাই নদী এখন মরা খালে পরিনত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে প্রশাসনের কিছু দুনীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী সহযোগিতায় এই নদীর জায়গা দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ভাটা পরিচালনা করে আসছে। বাসাইলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বংশাই নদীর দুই পারে গড়ে উঠেছে ইটভাটা ও রাইসমিল। লাঙ্গুলিয়া নদীর পাড়ের বিশাল এলাকা জুড়ে বানানো হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি। অনেক জায়গায় বাঁধ দিয়ে চলছে মাছ চাষ।
বৈরান নদী গোপালপুর পৌর শহর পাড়ি দিয়ে দিয়ে দক্ষিণে ভুঞাপুর উপজেলার পাঁচটিকরিতে ঝিনাই নদীর সাথে  মিলিত হয়েছে। এ নদীর তীরে গড়ে উঠেছে গোপালপুর উপজেলা সদর। এই নদীর অস্তিত্ব এখন আর নেই বললেই চলে। শুস্ক মৌসুমে নদীর তলদেশে পুরোটাই বোরোর আবাদ হয়। গোপালপুর পৌরসভার অংশে নদীর উভয় পার দখল করে বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে ভুমিদস্যুরা।
পরিবেশ ও নদী গবেষক গৌতম চন্দ্র চন্দ জানান, বাংলাদেশ নদী মাতৃকদেশ। পরিবেশ সুন্দর রাখতে নদীর ভুমিকা অপরিসীম। নদী সচল না থাকলে বিভিন্ন বর্জ জমে জীব বৈচিত্র ধ্বংস হয়ে পরিবেশের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলে। খুব শীঘ্রই নদীগুলো দখলমুক্ত করে সংস্কার না করতে পারলে পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

Share.

About Author

Leave A Reply