বড় পণ্ডিত, বড় মানুষ

0

১৯৭১ সালে ভারতে শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির পক্ষে এর সভাপতি ড. এ আর মল্লিক আর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি উত্তর ভারতে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচার-অভিযান চালাতে যাই। আমাদের সঙ্গে ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির পক্ষে অনিল সরকার, অনিরুদ্ধ রায় ও বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী। আর ছিলেন সৌরীন ভট্টাচার্য। বাংলাদেশ সরকারের ইচ্ছায় আমাদের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়েছিল গণপরিষদের সদস্য সুবিদ আলীকে। একপর্যায়ে আমরা গিয়ে উঠেছিলাম দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথিনিবাসে। কী কারণে যেন জায়গাটা আমাদের কারও কারও ভালো লাগছিল না। আমাদের সঙ্গীরা তা বুঝে খানিকটা বিকল্প ব্যবস্থা করলেন। এক সকালে তপন রায়চৌধুরী এসে তাঁর গাড়িতে করে ড. মল্লিককে নিয়ে গেলেন নিজের বাড়িতে। সেদিনই বিকেলে রণজিৎ গুহ এসে আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁর বাসস্থানে। তপনদা তখন অক্সফোর্ডে, রণজিৎদা সাসেক্সে। দুজনই গ্রীষ্মাবকাশে দিল্লিতে এসেছেন। দুজনই স্বেচ্ছায় দায়িত্বটা নিলেন। উভয়ের সঙ্গেই আমাদের সেই প্রথম আলাপ।
১৯৭৪ সালে কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমিক স্টাফ ফেলোশিপ নিয়ে আমি লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে যাই এক শিক্ষাবর্ষের জন্যে। তখন ওঁদের দুজনের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা হয়। তপনদা আমাকে অক্সফোর্ডে বক্তৃতা দিতে আহ্বান জানান, রণজিৎদা সাসেক্সে। অক্সফোর্ডে দেওয়া বক্তৃতাটি পরে ‘স্বরূপের সন্ধানে’ নামে রূপান্তরিত হয়ে বহুল প্রচার লাভ করে।
আমি বিলেত যাওয়ার অল্পদিন পরে অক্সফোর্ডে কামাল হোসেন এলেন সপরিবারে। তার আগেই সেখানে আমার পরিচিত দু-চারজন ছিলেন। পরে আরও আসতে লাগলেন। ফলে আমারও সেখানে ঘন ঘন যাতায়াত চলতে থাকল—কখনো একা, কখনো সপরিবারে। তপনদা, কামাল হোসেন ও রফিউদ্দীন আহমদকে নিয়ে, আমার ভাষায়, একটা বরিশাল-বৃত্ত রচিত হয়েছিল। তা নিয়ে কিছু ঠাট্টা-তামাশা আমরা করেছি। তবে বরিশালের প্রতি পক্ষপাত নিয়ে তপনদা এতই স্পষ্টভাষী ছিলেন, আমাদের ওসব কথা তাঁকে স্পর্শ করতে পারত না।
তার পরও একটু বেশি সময়ের জন্য লন্ডনে গেলে অক্সফোর্ডে যাওয়া ছিল আমার পক্ষে অনিবার্য। সেখানে যাওয়া মানেই তপনদা-হাসিদির সঙ্গে দেখা হওয়া। অক্সফোর্ডের বাইরেও তপনদার সঙ্গে কতবার দেখা হয়েছে—কলকাতায় ও দিল্লিতে, ঢাকায় ও চট্টগ্রামে, লন্ডনে ও টরন্টোতে। প্রতিবারই তাঁর সম্পর্কে কিছু জানা হয়েছে এবং তাঁর মুখ থেকে জেনেছি নানা বিষয়ে নানাকিছু। একবার টরন্টো ইউনিভার্সিটিতে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছিল অনেকক্ষণ ধরে—সঙ্গে ইংরেজিতে তার টীকাভাষ্য করেছিল। অনুষ্ঠানের শেষে তপনদা আমাকে বললেন, এমন উপস্থাপনা শুনতে তিনি পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় যেতে প্রস্তুত।
লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে বসে যখন ইউরোপ রিকনসিডার্ড বইয়ের মালমশলা সংগ্রহ করছিলেন, তখন রোজই তাঁর পাওয়া আলোকসঞ্চারী কোনো তথ্য নিয়ে খাওয়ার সময়ে কথা বলতেন আর আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম। একবার ব্রিটিশ মিউজিয়ামে দিনব্যাপী আয়োজিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আলোচনা, সন্ধ্যায় আনুষঙ্গিক কোনো বিষয়ে অপেক্ষাকৃত হালকা কথাবার্তা। বাঙালি রান্না-বিষয়ে আলোচনার সময়ে তপনদা ছিলেন শ্রোতাদের মধ্যে বসে। সঞ্চালকের পীড়াপীড়িতে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তাঁকে দু-চারটে কথা বলতে হলো। বললেন, বাঙালি খাবার সম্পর্কে মুখ্য কথাটা এই যে, সেটা গৃহগত বস্তু, বাণিজ্যিক খাদ্য নয়। কলকাতায় টাইপরাইটারে কাজ করতে করতে তিনি একদিন টেলিফোন করে নবনীতা দেবসেনের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, রিবন যখন শুকায়ে যায়, তখন কী করতে হয়। ঢাকার এক দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যের পাতায় আমি তাঁর রোমন্থন-এর পরিচয়মূলক একটি লেখা লিখেছিলাম। কলকাতায় পৌঁছে ফোনে তাঁকে সে খবর দেওয়ায় তিনি সঙ্গে সঙ্গে চলে এলেন আমার হোটেলের কামরায়। তৎক্ষণাৎ লেখাটি পড়ে ফেললেন, তারপর আমাকে অনেক সাধুবাদ জানালেন।
তপন রায়চৌধুরীর পাণ্ডিত্য সম্পর্কে বলার যোগ্যতা আমার নেই। আরম্ভ করেছিলেন আকবর ও জাহাঙ্গীরের শাসনামলে বঙ্গদেশের অবস্থা নিয়ে। অনেকদিন পরে নতুন একটি ভূমিকাসহ এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। বইটি প্রথমেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। দ্বিতীয় সংস্করণের নতুন ভূমিকা বিবেচিত হয় এ-অঞ্চলের ইতিহাসের বিকাশে নৃতত্ত্বের ভূমিকা-বিষয়ে সম্পূর্ণ নতুন বিশ্লেষণ হিসেবে। সেখান থেকে করমণ্ডলে ইয়ান কোম্পানির প্রায় শতবর্ষের ইতিহাস। তারপর যৌথ গবেষণাকর্ম কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়-প্রকাশিত ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস। অন্যদিকে ইউরোপ পুনর্দর্শন। তারপর দেশে-বিদেশে গবেষণা পত্রিকা-সম্পাদনা এবং গবেষণা পত্রিকায় নানা ধরনের প্রবন্ধ-প্রকাশ। রচনার বৈচিত্র্যে এবং পরিমাণে সবাইকে চমকিত করেছেন তপন রায়চৌধুরী।
আরও চমক বাকি ছিল। সেটা এল রোমন্থন অথবা ভীমরতিপ্রাপ্তর পরচরিতচর্চা বইতে। ৬৫ বছর বয়স পেরিয়ে বাংলায় বই লিখলেন তিরিশ ও চল্লিশ দশকে তাঁর জন্মভূমি বরিশাল নিয়ে। আর কী সে বাংলা! প্রমিত চলতি ভাষায় বর্ণনার সঙ্গে পাত্র-পাত্রীর মুখে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষার মিশেল। সেই আঞ্চলিক ভাষার অদম্য পৌরুষকে তিনি ধ্রুপদী অকুণ্ঠতা বলে চিহ্নিত করেন। সেই ‘দেবগন্ধর্বনিন্দিতা মহতী ভাষার’ পশ্চিমবঙ্গানুবাদ দিয়েছেন মাঝে মাঝে, কিন্তু সর্বত্র নয়। সর্বত্র নয় কেন? ‘সেন্সররা আপত্তি করতেন’। লেখকের কৌতুকবোধ বইটির একমাত্র সম্পদ নয়। বর্ণিত সময়ে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক কেমন বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক কারণে এবং ১৯৪৬-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে মানুষের আচরণ কেমন পাশব প্রবৃত্তিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তার শোকাবহ বিবরণ এতে গ্রথিত হয়েছে।
নিজের হৃদ্যন্ত্রের শল্যচিকিৎসা নিয়ে প্রায় অনুরূপ কৌতুকাবহ রচনা লিখেছিলেন ‘হৃদয়বিদারক’ নামে। তার পরই বিশালাকৃতির গ্রন্থ বাঙালনামা—লেখকের ৮০ বছরের স্মৃতিকথা। এ শুধু তাঁর আত্মবিকাশের কাহিনি নয়, তাঁর পারিপার্শ্বিকতার পরিবর্তনতার ইতিহাস। মানুষ, জনপদ, বিদ্যায়তন, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক কর্মধারা—সবই এতে বর্ণিত হয়েছে। লেখকের প্রথম জীবন বরিশাল অঞ্চলে কেটেছে, তারপর কলকাতায় অধ্যয়ন, দিল্লিতে অধ্যাপনা, তারপর গবেষণা ও অধ্যাপনায় ইউরোপ ও আমেরিকায় বাস। কত বিচিত্র দেশে গেছেন কর্তব্যকর্মে ও ভ্রমণে, কত বিচিত্র মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন—নামকরা বিদ্বান থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত। সবার সম্পর্কেই এবং সবকিছু সম্পর্কেই স্পষ্টভাষায় কথা বলেছেন।
এই স্পষ্টভাষণের একটা প্রাসঙ্গিক দিক হলো সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় বক্তব্য। বইটি যখন ধারাবাহিকভাবে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, তখন পাঠকদের কেউ কেউ সে পত্রিকায় চিঠি লিখেই তাঁকে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট বলে বর্ণনা করেছিলেন। এ হলো আমাদের দেশে নিরপেক্ষ হওয়ার বিপদ। ‘অন্য’দের সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে কথা বললে যাঁরা খুশি হন, ‘নিজে’দের সাম্প্রদায়িকতার উল্লেখে তাঁরা অসন্তোষ ব্যক্ত করেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা তপন রায়চৌধুরীর মজ্জাগত—নিজের রচনায় তার প্রকাশ অনিবার্য। শুধু তা-ই নয়। তাঁর মানবিকতা ও সংবেদনশীলতা এমন পর্যায়ের যে কেবল ভিন্নমতের নয়, প্রায় শত্রুস্থানীয় লোকের জন্যেও তিনি সহানুভূতি বোধ করেন। প্রচ্ছন্ন কৌতুকবোধ আর সর্বব্যাপী এই সহানুভূতি এই বইয়ের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য।
তপন রায়চৌধুরী বড় পণ্ডিত, বড় মানুষ। সব বড় পণ্ডিত বড় মানুষ হন না, কেউ কেউ হন। তপনদা তাঁদের একজন। তাঁর অন্তরে স্নেহের যে ফল্গুধারা প্রবাহিত হতো, তাতে অবগাহনের সুযোগ আমার হয়েছে। এ আমার জীবনের এক বড় সৌভাগ্য।

Share.

About Author

Leave A Reply